About the author ( লেখকের নিজের কথায়)

একটা লম্বা উঠোন, তার একপ্রান্তে রোগা মতো এক বেলগাছ, অন্যপ্রান্তে পায়রার খোপের মতো পায়খানা বাথরুম, ইঁটের উপর শ্যাওলাজমা ভেজা ভেজা এক পরিসর–এসবের থেকে বিশ গজ মতো দূরে একটা শক্তপোক্ত দশ ফুটিয়া নিম গাছ, তার নিচে ছড়িয়ে আছে হলুদ নিম ফল, উপরে তাকালে পাতার জালির ফাঁক দিয়ে সূর্যের ছিনিমিনি, কখনো কখনো বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে একা একা ছায়া আর আলোর খেলা দেখা, বিকেলের নির্দিষ্ট প্রহরের পর ক’জন খেলার সাথির সঙ্গে একটা ঝুপসি মতো আমবাগানে টগর গাছের মোটা, প্রায় অর্ধশায়িত কাণ্ডের উপর বসে, ঝুলে, অথবা শুয়ে পড়ে গল্প করা–ছোটবেলা বলতে আলগা আলগা এসব ছবি মনে ভেসে আসে।

বাবা রেলে ছিলেন, মা ক্যালকাটা টেলিফোনসে। মনে পড়ে, বাবার ট্রান্সফারের পর, মার সঙ্গে অনেকগুলো একা একা দিন কাটিয়েছি। সাংসারিক ঝামেলা সামলে মা, আমার সঙ্গে গল্প করার বেশি সময় পেতেন না। কিন্তু তার বিকল্প হিসেবে হাতে ধরিয়ে দিতেন বই।

নানা স্বাদের রোমাঞ্চকর বই। ভূত পেত্নি দত্যি দানো, এদের সঙ্গে তখনই আমার দেখাশোনা; লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। মনে পড়ে, বাংলা ব্যকরণে খুব খারাপ ছিলাম। ইংরাজি সাহিত্য মাথায় ঢুকত না। বাংলা মিডিয়ামে পড়ে ইংরাজি দুর্বল হয়ে যাবে ভেবে, সেই ছোট্ট রেল শহরে, মা কোথা থেকে খোঁজ করে র‍্যাপিড রিডার কিনে এনে পড়তে দিত। কিন্তু সেসব পড়ে আরাম কই? শেখার জন্য পড়তে ভালো লাগত না। অনেক বড় বয়স অবধি শুধুই আনন্দ পাওয়ার জন্য পড়েছি। এইট অবধি অতি সাধারণ ছাত্রী হিসেবে প্রচুর ল্যাদ খেয়ে, আর প্রচুর ‘ছাঁইপাশ’ পড়ে দিন কাটিয়েছি। এখন মনে পড়লে ভাবি, ভাগ্যিস!

স্কুল পরবর্তী পড়াশুনা মুম্বইতে করেছি। কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় হিসেবে জুটেছিল রসায়ন। ত্রাস আর সংশয় ঘটিয়ে ফেলার একমেবাদ্বিতীয়ম বিষয়। মজার ব্যাপার হল, এই প্রথম কঠিন জিনিস ভালোবেসে ফেললাম। হয়ত ছাঁইপাশ পড়লে কঠিন জিনিসের প্রতি সহ্যক্ষমতা তৈরি হয়। ফর এ চেঞ্জ, রেজাল্ট ভালো হল। চাকরি পেলাম এক ঔষধ নির্মাতা বহুজাতিকে। কিন্তু কপাল মন্দ অথবা ভালো যাই হোক না কেন, কলকাতা ফিরতে হল। তারপরেই দুমদাম বিয়ে আর সরকারি চাকরিপ্রাপ্তির বিচিত্র কিছু সমাপতনে সাত আট বছর কেটে গেছে, কিচ্ছু না পড়ে, কিচ্ছুটি না করে; সংসার করাটাকে যথেষ্ট করা মনে হয়নি কোনোদিনই। নিজেকে বেমানান লাগত সংসারে, এখনো লাগে। ক্লান্তিকর সংসার আর তার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে প্রাণ হাঁসফাঁস করত, আর তখনই ম্যাজিকের মতো একদিন সকালবেলা রান্না করতে করতে আপন খেয়ালে কটা শব্দ লিখে ফেলেছিলাম। মেজে ঘষে সেটাকে একটা গল্প হিসেবে দাঁড় করানো গেল। পাঠিয়ে দিলাম এক লিটল ম্যাগাজিনে। ছাপাও হল।সময়টা ২০১৭।

এর পর যাত্রা বেশ মসৃণ ছিল। লিটল ম্যাগাজিনে লেখালেখি করতে করতে ২০১৯ সালে আদতে আনাড়ি নামের মূল ধারার একটি গল্প সংকলনে প্রকাশিত গল্প নিশিগন্ধা, সকলের বেশ প্রশংসা পেল। আনাড়িমাইন্ডস নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হল। এই গ্রুপের ডিজিটাল পূজাবার্ষিকী হল একচালা। বর্তমানে আর প্রকাশিত হয় না। কিন্তু যে ক’বছর প্রকাশিত হয়েছিল বিপুল সাড়া পেয়েছিল। একচালাতে প্রকাশিত হয় দর্শনা বোস সিরিজের প্রথম উপন্যাস বৃশ্চিক। প্রায় পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি মানুষ উপন্যাসটি পড়েন। আনাড়িমাইন্ডস এরপর প্রকাশনায় এলে, বৃশ্চিক আর বৃশ্চিকচক্র একত্রে গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে দর্শনা বোসের সমস্ত উপন্যাস ছাপছে অন্তরীপ। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য, আনাড়িমাইন্ডস না থাকলে লেখিকা হিসেবে আমার যে সামান্য পরিচিতি, তা কখনোই তৈরি হত না। পেশাগত ব্যস্ততার কারণে আনাড়িমাইন্ডস ভেঙে যায়, প্রকাশনা থেকে দূরে সরে আসতে হয়, কিন্তু আমার ব্যক্তিজীবনের একটি বিশেষ অধ্যায় হিসেবে আনাড়িমাইন্ডস চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।

পাঠক আমাকে মূলত গোয়েন্দা উপন্যাস বা অলৌকিক গল্পের লেখিকা হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেইটি আমার বিরাট পাওনা। যখন লিখতে বসি, যে কোনো জনরার মাধ্যমে নিটোল একটি গল্প শোনানোই আমার কাজ। এই কাজটি আমি ধীরে সুস্থে করতে ভালোবাসি, তাই থ্রিলার বা ভয়ের গল্পে আমার পছন্দ স্লো-বার্ন গল্প। রোমাঞ্চ যেখানে অবশ্যত একটি উপাদান, কিন্তু একমাত্র উপাদান নয়। আশঙ্কা ছিল এই ধরণের গল্প কেউ ধৈর্য ধরে পড়ে দেখবেন না। সে আশঙ্কাকে অংশত মিথ্যা প্রমাণ করেছেন কিছু পাঠক, তাঁদের প্রতি আমার আভূমি প্রণাম।

আশা রাখি, আমার পরবর্তী প্রচেষ্টাগুলিতেও তারা একইভাবে পাশে থাকবেন।

Read more

Browse The Collection