বৃশ্চিকচক্র
by Piya Sarkar
Reviews
পুলিশ অফিসার দর্শনা বোসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ২০২০-র ‘একচালা’ পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত ‘বৃশ্চিক’-এর মাধ্যমে। সেই লেখাটি শুধু আমায় নয়, এই সময়ের প্রায় সব রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের অনুরাগীকেই মুগ্ধ করেছিল। তখন থেকেই দাবি উঠেছিল, দর্শনাকে যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনার।
তিনি ফিরলেন এই বইয়ের মাধ্যমে।
শক্ত মলাটে, ভালো বাঁধাই এবং মোটা কাগজে পরিষ্কার ও নির্ভুল ছাপায়, ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলংকরণে সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছোল মোট দু’টি লেখা~
১) বৃশ্চিক;
২) বৃশ্চিকচক্র।
এই দু’টি কাহিনি নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলতে গেলে একগাদা স্পয়লার বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা আছে। তাও লেখার চেষ্টা করি।
প্রথমটি বড়োগল্প। তার বিষয় হল একটি খুনের তদন্ত। কিন্তু সেই তদন্তের সূত্রে একে-একে বেরিয়ে এল অনেক পুরোনো পাপ আর তার দীর্ঘতর ছায়া। শৈশব থেকে যে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে চলেছে দর্শনা, তারই সঙ্গে মিশে গেল সেই ছায়ারা। গল্প শেষ হল একবুক উৎকণ্ঠায় পাঠককে রেখে।
দ্বিতীয়টি উপন্যাস। এও আপাতভাবে একটি খুনের তদন্ত। কিন্তু তারই মধ্যে মিশে আছে বাংলার রাজনীতি আর রক্ত— দুইয়েরই লাল রঙ। এরও শেষে, অনেক আগুন পেরিয়ে, দর্শনা পেল তার জীবনের আরও একটি ধাঁধার সমাধান। কিন্তু এবার কোনদিকে যাবে সে?
তিনটি কারণে এই বইটিকে আমি রহস্যপ্রেমীদের অবশ্যপাঠ্য বলে দাবি করব। তারা হল~
(১) রাজর্ষি দাস ভৌমিকের ‘কলকাতা নুয়া’-র মতো এও এক নিবিড়ভাবে বাস্তবানুগ পোলিস প্রসিডিওরাল। কিন্তু এর রূপ, রস, গন্ধ ও স্পর্শ— ওই সিরিজের থেকে একেবারে আলাদা। পদ্ধতির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও এটি দারুণভাবে ভাববাহী। অজস্র সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আইনরক্ষকেরা কীভাবে সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যেতে পারেন (এবং যান)— তার এক দুর্ধর্ষ নিদর্শন এই দু’টি তদন্ত।
(২) দর্শনা বোসের মতো রক্ত, ঘাম, অশ্রু দিয়ে গড়া বাস্তব রহস্যভেদী বাংলায় এর আগে আমরা কক্ষনও পাইনি। এই চরিত্রটির সঙ্গে পথ চলার টানেই এই বই পড়ে যেতে হয়।
(৩) রাজনীতি বস্তুটিকে রহস্য কাহিনিকারেরা এড়িয়ে চলেন নানা কারণে। এই দু’টি উপন্যাস কিন্তু ভীষণভাবে ব্যতিক্রমী। এখানে বাংলার রাজনীতি নিজেই একটা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অথচ কেঠো বিবৃতি বা প্রোপাগান্ডার ফাঁদ এড়িয়ে লেখা দুটো দাবার চালে বোড়ে হয়ে পড়া অসহায় মানুষদের কেন্দ্রে রেখে এগিয়েছে।
তার সঙ্গে যুক্ত হয় মনস্তত্ত্বের গভীর প্রয়োগ। ষড়রিপুর সঙ্গে মিশে যান সুকুমার রায়।
আর সবার উপরে থাকে বিষে নীল হয়ে যাওয়া এক সময়— যার স্রোতে ভেসে যায় দেশ, সমাজ, সম্পর্ক।
‘বৃশ্চিকচক্র’ শুধু পড়তে শুরু করুন। বাকিটা এই লেখারাই করে নেবে। আর তারপর আমার মতো আপনিও ভাববেন,
“আবার কবে দর্শন দেবে, দর্শনা?”
অলমিতি।

বৃশ্চিক পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, বৃশ্চিকচক্রও হতাশ করেনি। এবার দর্শনা বোস ফিরেছে আরও বড় পরিসরে, রহস্যের জাল এবার আরও জমাট বাঁধা। নিখুঁত পুলিশি তদন্ত, ডিটেইলিংয়ের সাথে বামপন্থী উগ্রবাদী রাজনীতি, ভেতরের দুর্নীতি, স্পাইয়িং, মাফিয়া কারবার যুক্ত হয়েছে। দুটো ভিন্ন জায়গায় একের পর এক বীভৎস খুন, এরপর পিয়াজের খোসার মত রহস্য উন্মোচন, ফরেনসিক ডিটেইল, ন্যারেটিভ সবমিলিয়ে ভালোই উপভোগ করলাম। শেষে বেশ কয়েকটা ভালো টুইস্ট আছে। দুয়েকটা যদিও আন্দাজ করতে পেরেছি, তবুও ব্যাখ্যা মনঃপুত হয়েছে। আউট অফ ব্লু কিছু নেই। পুরো বইই ভালো লেগেছে, তবে মাওবাদীদের কর্মকাণ্ড মধ্যখানে একটু বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। সবমিলিয়ে যাদের পুলিশ প্রসিডিওরাল পছন্দ তাদের জন্য রিকমেন্ডেড।

অতঃপর শেষ করলাম। কিন্তু শেষ করার পর একটাই অনুভূতি হচ্ছে আর সেটা হলো দর্শনা বোসের মত আমার নিজেরও ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। কিছু কিছু সত্য হয়ত অপ্রকাশিত থাকাই মঙ্গল।
পাঁচ তারকা দিতে চাচ্ছিলাম কিন্তু মাওয়িস্টদের নিয়ে একটু বেশি আলাপ বিলাপ পছন্দ হয়নি ওটা পাশ কাটিয়েও হয়ত যাওয়া যেত কোনোভাবে।

দর্শনা বোস সিরিজের নতুন বই ‘নিষাদ’ পড়বো বলে ভাবলাম আগেরগুলোয় চোখ বোলানো যাক। সিরিজের প্রথম বই ‘বৃশ্চিক’ আগে পড়া ছিলো, তাই সেটা রি-রিড হলেও ‘বৃশ্চিকচক্র’ আগে পড়িনি।
দর্শনা বোস এবারেও দারুণ গল্প নিয়ে এসেছেন। এবারেরটা আগেরটার সাথে বেশ অনেকটাই লিংকড, কিন্তু আরো বৃহৎ পরিসরে। নিশ্ছিদ্র থ্রিলার হিসেবে এটাও বেশ উপভোগ করেছি। বেশি ভালো লেগেছে দর্শনা বোসের পার্সোনাল ট্রাজেডিটার লিংকটা এত সুন্দরভাবে মিলিয়ে ফেলতে পারার ব্যাপারটা। জানি না প্রথম বইটা লেখার সময়ই লেখক এটা মাথায় রেখেছিলেন কিনা। তবে যেটাই হোক দারুণ লেগেছে ব্যাপারটা।

