বম্বে, মহারাষ্ট্র
অক্টোবর, ১৯৫৬

বিকেল পাঁচটা একটা আশ্চর্য সময়। প্রতিদিন ঠিক এইসময়, নবরতন ফিল্মসের লাল রঙের বিরাট অফিসবাড়ির ছায়াটা লম্বা হয়ে-হয়ে ওপাশের ফুটপাথ ছোঁয়। খেলাটা নতুন আবিষ্কার করেছেন কুমার। নিয়ম করে এই সময়ে ঘড়ির দিকে নজর চলে যায় ওঁর। রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকেন ঘড়ির কাঁটার দিকে। কাঁটাটা চারটে উনষাট ছাড়িয়ে পাঁচটায় পৌঁছালেই শিশুর মত খুশিতে লাফিয়ে ওঠেন তিনি। অত বড় বাড়িটা যেন ঐ সময়ে মাথা নুইয়ে ভূমিস্পর্শ করে। কুমার দেব যে রোজ-ই এখানে আসেন, তা নয়। পারিবারিক ব্যবসা সামলাতে আগে কচ্চিৎ কদাচিৎ আসতেন। বাকিসময় দাদারাই দেখে দেন। গত পনেরদিন ধরে একজন রেঙ্গুন, আরেকজন কলকাতা থাকায় বাধ্য হচ্ছেন আসতে। ফিল্ম প্রযোজনায় নবীন বলা চলে তাঁদের। উদ্যোগে আর উদ্যমে নয়।
আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোবেন ঠিক করা ছিল। ড্রাইভার পিছনের গেটে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে অনেকক্ষণ। সামনের গেটে একটা জটলা আছে বলে খবর পেয়েছিলেন আগে। বিখ্যাত হিরো এবং নবরতন ফিল্মসের অন্যতম অংশীদার কুমার দেব জুহুর এই ঠিকানায় নিয়মিত আসছেন, এ কথা জেনে ফেলেছে উৎসাহীরা। কিছু ফ্যান, কিছু উমেদার, কিছু চিত্র-সাংবাদিকের ভিড় জমেছে আজ। কুমার ফ্যান-পরিবৃত্ত হতে ভালোবাসেন। খবরের কাগজের বা ফিল্মি পত্রিকার সাংবাদিকদেরও না-পসন্দ করেন না। মোটামুটি সৌহার্দ্যের সম্পর্ক রয়েছে দু তরফে। তবে, আজ তাঁর ইচ্ছে করছিল না।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে দ্রুত পিছনের গেটের দিকে পা চালালেন কুমার।
গাড়ির দরজা বন্ধ করতেই, শীতল শান্তি নেমে এল শরীর জুড়ে। বিদেশী গাড়ির এই মডেলটা নতুন কিনেছেন গত মাসে। কাচ উঠে গেলে মনে হয় বাইরে নির্বাক চলচ্চিত্র চলছে। ফুটপাথে জুড়ে ব্যস্ত মানুষের ঢল নেমেছে এখন। বিকেল পাঁচটা বলে ভিড়ের চরিত্র সামান্য ‍আলাদা। পদক্ষেপগুলো সামান্য বিক্ষিপ্ত ও শ্লথ। সারাদিনের নিয়মবাঁধা দৌড়ের শেষে, মানুষ ঘরে ফিরছে; মাথা নীচু, ঘাড় গুঁজে পথ চলছে। কুমার জানেন, ওদের মনে কী চলছে। কর্মস্থলে যে জীবনযুদ্ধ লড়তে হয়, তাতে ওদের অধিকাংশকে প্রতিদিন একটু একটু করে জায়গা ছাড়তে হয়। প্রতিদিন স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে ফারাকটা দীর্ঘতর হয়। সারাদিনে ওদের জীবনে এমন একটাও ঘটনা ঘটে নি, যাতে ওরা সামান্য হলেও নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতে পারে, কিছুটা হলেও মনে করতে পারে যে ওরা ভালো আছে। দিনের এই সময়টায়, ওদের মুখে সেসব গল্প লেখা থাকে। ওরা আশেপাশে তাকায় না, চলতে চলতে কখনও থেমে পড়ে না, দু-মিনিটের জন্য সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়ে চোখ ভিজায় না। অথচ বিকেলের এই সময়টা, প্রকৃতি রোজ এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত সেজে ওঠে! আকাশে এমন চমৎকার আভা! বাতাসে এমন হালকা ছন্দ! এই না-হক সৌন্দর্যের উপর কোনো দাবি না রেখে, কোনো প্রশ্ন না তুলে ওরা হেঁটে চলে।

কুমারের নিশ্চিত বিশ্বাস, অপ্রাপ্তির এই গল্পগুলো থেকে চমৎকার সিনেমা হতে পারে। তবে, সে সিনেমা হবে আশার, আনন্দের। তিনি বিনোদন জগতের মানুষ। স্বপ্ন দেখিয়ে যাওয়াই তাঁর কাজ। একবার এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, “হোয়াই ডু ইউ অলওয়েজ প্লে ফ্ল্যামবয়েন্ট রোলস?” কুমারের উত্তর স্পষ্ট ছিল। তিনি চান, এই লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে প্রতি রাতে শুতে যাবেন, তাঁর অভিনয়ের কথা মনে পড়লে ওঁদের মুখে যেন এক চিলতে হাসি লেগে থাকে। সিনেমায় হলেও, ওঁরা যেন ওঁদের সব সাধ মিটিয়ে নেয়। এ ঠিক সেই খেলাটার মতো; এক গগনচুম্বী মিনার যেন মিছিমিছি মাটি ছুঁয়ে ফেলেছে।
গাড়িটা গিরগাঁও চৌপাটির কাছে পৌঁছেছে। ড্রাইভার প্রশ্ন করল, “কুটে যাইচা আহে স্যার?”
কুমারের গন্তব্য আজ বহুদূরে। তবে, সামান্য উদ্বৃত্ত সময় আছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “মেরিন ড্রাইভ চলা, ভাস্কর।” গোটা বম্বে শহরের মধ্যে মেরিন ড্রাইভ জায়গাটি কুমার দেবের সবথেকে প্রিয়। গিরগাঁও চৌপাটি থেকে, নরিম্যান পয়েন্টের দিকে সোজা এগিয়ে আসলেই তাঁর মুড পাল্টে যায়। মাঝে মাঝে গভীর রাতে, একা গাড়ি চালিয়ে আসেন এদিকে। মুক্ত সৈকত থেকে ছুটে আসা দুরন্ত হাওয়ার সামনে দাঁড়ান দু-হাত মেলে। নিজের লার্জার-দ্যান-লাইফ অস্তিত্বটা চুটিয়ে উপভোগ করেন। আজ নেমে হাওয়া খাওয়ার পরিস্থিতি নেই। এসি বন্ধ করিয়ে গাড়ির কাচ নামালেন কুমার। অক্টোবরের শেষ বলে হাওয়ার মেজাজে সামান্য বদল এসেছে। সূর্য এখন পশ্চিমে পুরোপুরি ঢলে পড়েছে। একটু পরে মালাবার হিলসের আকাশরেখার পিছনে টুপ করে ডুবে যাবে। রূপোলি ফিতের মত রাস্তা, ডানদিকে আরবসাগরের খাঁড়ি, আর বাঁদিকে সারি দিয়ে মুগ্ধদর্শন কিছু স্থাপত্য; সন্ধ্যা নামলেই হাজার তারার রোশনাই নিয়ে জ্বলজ্বল করে উঠবে। লোকে বলে কুইনস নেকলেস। দেবের সেই নামটি পছন্দ নয়। বরং মেরিন ড্রাইভে আসলে, তাঁর বীণার গাওয়া গানটির কথা মনে পড়ে। বাংলা গান। একটা শব্দের অর্থও তাঁর জানা নেই, অথচ কে যেন গানটাকে মর্মে গেঁথে দিয়েছে।
সেবার কী এক খেয়ালে, বীণার সঙ্গে হেঁটে উঠেছিলেন মালাবার হিলসের চূড়ায়। বীণাই জেদ করেছিলেন। বলেছিলেন, যা দেখবে, জন্মজন্মান্তরে ভুলবে না। দেবের সামান্য আপত্তি ছিল। বীণার কথা তবু ফেলতে পারেননি। আর সত্যি, সেদিন যা দেখেছিলেন দেব, তা কখনও ভুলতে পারেননি। সেদিন, আজকের মতই সন্ধে নামছিল। মায়াবী, অলৌকিক গোলাপি-কমলা রঙ লেগেছিল আকাশে। সুদূরে তাকালে দেখা যায় সমুদ্র ঝাঁপিয়ে পড়ছে পাথুরে সৈকতে। প্রতিটি সংঘর্ষে মনে হয়, যেন এক ঝাঁক শঙ্খচিল, সাদা ডানা মেলে উড়ে এসে হঠাৎ হারিয়ে যাচ্ছে পাথরের বুকে। ঠান্ডা একটা হাওয়া বইছিল পাহাড়ের উপরে। বীণা একটু ধারে এগিয়ে গিয়েছিলেন। দেব একটা পাথুরে ঢিবির উপর বসে আনমনে সিগারেট ধরিয়েছিলেন। আকাশ ধীরে ধীরে রঙ বদলালো। গোলাপী-কমলা থেকে আগুনে কমলা, আগুনে কমলা থেকে হাল্কা বেগুনী; অবশেষে গাঢ় বেগুনীর পর্দায় ঢেকে গেল চরাচর। হাওয়ার গতিবেগ বাড়ছিল। আরব সাগরের অর্ধচন্দ্রাকার তীর ধরে এইসময় একযোগে জ্বলে উঠল আলো। যেন হাজার হাজার মোমবাতি, হাওয়ার দাপটে মাথা নোওয়াবে না বলে জেদ ধরেছে।

হাওয়ার শিরশিরানিটা চামড়া ফুঁড়ে রক্তে প্রবেশ করছিল। বাঁশীর সুরে যেমন মন কেমন করে ওঠে, মনে হয় অন্তরের কারুণ্য গলে ঠোঁটে জমা হয়েছে…ঠিক তেমনই মনে হচ্ছিল কুমার দেবের। কী আছে, অথচ কী যেন নেই! আশ্চর্য ভাবে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল চারপাশ। নিজের উষ্ণ নিঃশ্বাসের শব্দ নিজেই অনুভব করছিলেন কুমার। সেইসময় পিছনে বাবুলনাথ মন্দিরের সন্ধ্যারতির ঘন্টা বেজে উঠেছিল। বীণা ঘন্টার শব্দ শুনে চমকে পিছন ফিরে তাকিয়েছিলেন। তাঁর চোখ কুমারের চোখে মুখে কী যেন খুঁজল, তারপরে হতাশ হয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। দেবের একটু ভয় লাগছিল। অগোচরে একটা অস্বস্তি ঘনাচ্ছিল। বীণাকে নেমে যাওয়ার কথা বলবেন, ঠিক তখনই মধুর, বিষাদক্লিন্ন গলায় গান ধরলেন বীণা। নিঝুম আঁধারে প্রাচীন কোনো অপ্সরা যেন গেয়ে উঠলেন, “নিশি রাত, বাঁকা চাঁদ আকাশে/ চুপিচুপি বাঁশি বাজে বাতাসে, বাতাসে…”

“ইহা রুকনা হ্যায় স্যার?” ড্রাইভারের প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরে এল কুমার দেবের। গাড়িটা নরিম্যান পয়েন্টের বিখ্যাত নটরাজ হোটেলের সামনে এসে পৌঁছেছে। হাতে সময় থাকলে, এখানকার আইসক্রিম পার্লারটায় ঢু দিয়ে যান কুমার। হাতের ঘড়িটার দিকে আবার তাকালেন তিনি। আজ শনিবার। সাধারণ মানুষের ভিড় অপেক্ষাকৃত বেশি থাকবে। এই অবস্থায় কুমারের মবড হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এককালে মাথার টুপিটিকে একটা বিশেষ কায়দায় হেলিয়ে, চেনা অচেনা জায়গায় নির্বিকারে ঢুকে যেতেন। এখন সেটি-ই হয়ে উঠেছে সিগনেচার স্টাইল। বহু দূর থেকে মেয়েরা চিনে ফেলে, শোরগোল ওঠে…কুমার দেব…কুমার দেব।

নটরাজ হোটেলে ঢোকার সমস্ত প্রলোভনকে জয় করে, কুমার ড্রাইভারকে সম্পূর্ণ অন্য পথে চলার নির্দেশ দিলেন। পুনা রোড ধরে আশি মাইল এগোলে রাস্তার বাঁদিকে বিরাট এক ফার্ম হাউজ পড়ে। কয়েক একর জমি জুড়ে চাষ-আবাদ হয়। খামার আছে, পুকুর আছে। বিরাট চৌকোনো জায়গাটির ঠিক মধ্যিখানে সাদা রঙের এক দোতলা বাংলো বাড়িটিতে আগেও অনেকবার গেছেন কুমার। বম্বে শহরে আপাত-নিরীহ এই সন্ধেবেলাটুকু তাঁর জীবনে কমই আসে। পেশাদার জুয়ারির মতো প্রতিদিন হাসিমুখে বাজি খেলে যেতে হয়। বাজি জিতলে ফানুসের মতো আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করে। আবার পরমুহূর্তেই মনে পড়ে যায়, এই উড়ান সাময়িক। গোত্তা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে কতক্ষণ। ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে নীলচোখো হিরো অধিরাজ কাপূর। চার-পাঁচটা সিনেমায় মুখ দেখিয়ে পরিচালকদের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছে কুমার সন্দীপ। যদি এই যৌবন, যদি এই আবেদন, যদি এই অর্থ, যদি এই পরিচিতি সব আগামীকাল ফুরিয়ে যায়? বম্বের আকাশে উড়তে এসে ডানা ভাঙা পাখির মতো খসে যাবেন কুমার দেব! আতঙ্ক হয়। অসহায় লাগে। আর যখন এমন লাগে, আশ্রয়ের কথা মনে পড়ে। ফার্ম-হাউজটা তাকে বহুবার সেই আশ্রয় দিয়েছে। আরও স্পষ্ট ভাবে বললে, আশ্রয় দিয়েছে বাড়ির মালিক। বম্বের মানুষ তাঁকে অন্য পরিচয়ে চিনলেও, কুমার দেবের কাছে তাঁর একটাই পরিচয়। তিনি কুমারের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। বম্বে তাঁর কাছে যখন বিতৃষ্ণা আর বিনিদ্রার কারণ হয়ে ওঠে, তিনিও কুমারের মত ছুটে আসেন এখানে। নিজের হাতে চাষাবাদ করেন, রান্না করেন, বই পড়েন, স্ক্রিপ্ট লেখেন আর বন্ধুকৃত্য করেন। আজ সকালে, ছোট একটা টেলিফোন কলে ডেকে পাঠিয়েছেন কুমারকে। অবশ্য কী কারণে ডেকেছেন জানেন না কুমার। অতি সম্প্রতি তাঁর পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছে যে ছবিটি, তাতে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন কুমার। দুর্ধর্ষ ব্যবসা করেছে ‘তু পুলিশ ম্যায় চোর’। গ্ল্যামারাস ও পোড়-খাওয়া অভিনেত্রী ফিরদৌস আর কুমার দেবের জুটি নিয়ে ধন্য ধন্য করে উঠেছে চলচিত্র সমাজ। ফ্যানফেয়ার লিখেছে, গ্রেগরি পেক অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা। মুভিম্যানিয়া লিখেছে, দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি ফেস অফ বম্বে নুয়া- দ্য ফিউশন অফ আমেরিকান স্মার্টনেস অ্যান্ড ইন্ডিয়ান রোমান্টিসিজম। চোখ বন্ধ করে এসব প্রশস্তির কথা ভাবলে আলতো এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে কুমারের মুখে। সিলভার স্ক্রিন তাঁর যে হাসিতে মুগ্ধ, এ হাসি তেমনটি নয়। এ হাসিতে, নিজেকেই নিজে আদর করে ছুঁয়ে দেন কুমার। মনে মনে ভাবেন, আশার ফানুসটি আরেকটু দীর্ঘস্থায়ী হোক।